২০২৫ সালের মার্চে ইয়ারলুং সাংপো-যমুনা নদী ব্যবস্থার জলবিদ্যাগত তথ্য বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সইয়ের সিদ্ধান্তকে প্রথমে বন্যা পূর্বাভাস ও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
এই প্রশ্নকে সামনে এনে আলোচনায় এসেছে তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চীনা প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়না তাদের সমঝোতা স্মারক নবায়ন করেছে। এর আওতায় ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রকল্পের ধারণাপত্র এবং ২০২৬ সালে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পে নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, জলাধার তৈরি, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং আধুনিক জলবিদ্যাগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সমর্থকদের মতে, এটি উত্তরাঞ্চলের বন্যা, খরা ও নদীভাঙন সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ চীনা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্প কেবল একটি একক উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশ-চীন বৃহত্তর সহযোগিতার অংশ। ২০২৫ সালের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সময় বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার জন্য ৫০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরিতে বেইজিংয়ের সহায়তা চাওয়া হয়। এই পরিকল্পনা আগামী কয়েক দশকে দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও পানি বণ্টন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনার কাঠামো, জলবিদ্যাগত মডেল, সফটওয়্যার ও পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি যদি প্রধানত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রতিরক্ষা খাতে চীনা সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ নিয়ে অতীতে যে ধরনের উদ্বেগ দেখা গিয়েছিল, বিশ্লেষকদের মতে বেসামরিক অবকাঠামোতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সেন্সর, বন্যা পূর্বাভাস প্ল্যাটফর্ম, তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, তিস্তা প্রকল্পে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতার অভাব নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি, প্রকল্পের প্রযুক্তিগত কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে জনসমক্ষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত নির্ভরতার মাত্রা মূল্যায়ন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে, তিস্তা অববাহিকায় চীনের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে ভারতেরও। সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবাহিত হওয়া এই নদী ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজরে রয়েছে। তাদের মতে, চীনা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত জলবিদ্যাগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ও নদীসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মালিকানা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। অবকাঠামোর মালিকানা বাংলাদেশের হাতে থাকলেও যদি পরিচালনা, সফটওয়্যার হালনাগাদ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে আসবে।
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
