অভাব ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল, ছিল না কোনো আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধাও। তবু স্বপ্ন দেখা থেমে থাকেনি। পরিবারের আর্থিক সংকট, গ্রামীণ পরিবেশের নানা প্রতিবন্ধকতা এবং সুযোগের সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে নিজের মেধা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে জায়গা করে নিয়েছে যশোরের ঝিকরগাছার কিশোরী সুরাইয়া আক্তার জুঁই।সম্প্রতি বিকেএসপির অ্যাথলেটিক্স (ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড) বিভাগের ভর্তি ট্রায়ালে অংশ নিয়ে শত শত প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছে সে। তার এই সাফল্যে আনন্দে ভাসছে পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী এবং পুরো এলাকা।
ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের বেনেয়ালী কলোনিপাড়ার বাসিন্দা জুঁই। তার বাবা রাজু আহমেদ একজন ট্রাকচালক। সংসারের চাকা সচল রাখতে দিনের পর দিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ট্রাক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। মা বেবী খাতুন একজন গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে জুঁই দ্বিতীয়।
সাধারণ একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা জুঁই ছোটবেলা থেকেই ছিল মেধাবী ও প্রাণবন্ত। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে তার আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে সে ঝিকরগাছার এফজেডইউবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। শুধু খেলাধুলাতেই নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও সে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। বিদ্যালয়ে তার রোল নম্বর দ্বিতীয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেনেয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে শিক্ষকদের নজরে আসে জুঁই। তার প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাস দেখে শিক্ষকরা তাকে বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। বিশেষ করে শিক্ষক আশরাফুল ইসলামের অনুপ্রেরণায় সে নিয়মিত খেলাধুলা, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ শুরু করে।
শুরু থেকেই মাঠ ছিল তার প্রিয় জায়গা। ফুটবল ও অ্যাথলেটিক্স—দুই ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতা দেখিয়েছে জুঁই। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে বেনেয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তার দল। ওই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসে সে।
তবে ফুটবলের পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্সেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে জুঁই। দৌড়, দীর্ঘ লাফ ও উচ্চ লাফে ধারাবাহিক সাফল্য তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় নতুন উচ্চতায়।
২০২২ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে দৌড়ে প্রথম স্থান অর্জন করে সে। একই বছর উপজেলা পর্যায়ে উপস্থিত বক্তৃতা, দীর্ঘ লাফ ও উচ্চ লাফে কৃতিত্ব দেখিয়ে সবার প্রশংসা কুড়ায়। ২০২৩ সালেও জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় একক অভিনয়ে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করে। পাশাপাশি দৌড় ও দীর্ঘ লাফে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান লাভ করে নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
এ পর্যন্ত জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অন্তত ২২টি সনদ ও পুরস্কার অর্জন করেছে জুঁই। প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে কঠোর অনুশীলন, আত্মত্যাগ এবং সফল হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
ঝিকরগাছা স্পোর্টস ক্লাবে নিয়মিত অ্যাথলেটিক্স অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে আরও শাণিত করে তুলেছে সে। প্রতিদিনের অনুশীলন, পড়াশোনার চাপ এবং পারিবারিক বাস্তবতার মধ্যেও কখনো লক্ষ্যচ্যুত হয়নি। তার একটাই স্বপ্ন ছিল—একদিন বিকেএসপির শিক্ষার্থী হবে।
অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিকেএসপির ট্রায়ালে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড বিভাগের নিয়মিত প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে জুঁই।
জুঁইয়ের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি তার বাবা-মা। মেয়ের অর্জনকে জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন তারা। স্থানীয়রাও মনে করছেন, গ্রামবাংলার সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে জুঁই প্রমাণ করেছে, প্রতিভা ও পরিশ্রম থাকলে কোনো বাধাই সাফল্যের পথে অন্তরায় হতে পারে না।
এফজেডইউবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক ফরিদা পারভীন বলেন, “জুঁই অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী। খেলাধুলার প্রতি তার নিবেদন অসাধারণ। বিকেএসপির উন্নত প্রশিক্ষণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে সে আরও বিকশিত হবে। ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে—এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার।”
জুঁইয়ের এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো ঝিকরগাছার গর্ব। তার সাফল্যের গল্প নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে বলেই মনে করছেন এলাকাবাসী।
