বাড়িজাতীয়মোবাইল আসক্তিতে ঝুঁকিতে শিশুদের চোখ

মোবাইল আসক্তিতে ঝুঁকিতে শিশুদের চোখ

অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ও কিশোর দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় স্মার্টফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া বা স্বল্পদৃষ্টির হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়িয়ে তুলছে। এ পরিস্থিতির জন্য অভিভাবকদের অসচেতনতাকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মায়োপিয়া এমন একটি চোখের সমস্যা, যেখানে কাছের বস্তু স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের জিনিস ঝাপসা দেখায়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে এই রোগ দ্রুত বাড়ছে। বংশগত কারণ ছাড়াও দীর্ঘ সময় মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটার কিংবা বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা, সূর্যের আলোয় কম সময় কাটানো এবং ঘরের ভেতরে বেশি সময় অবস্থান করাও এর অন্যতম কারণ।
সম্প্রতি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অনেক শিশুর হাতেই মোবাইল ফোন। কেউ ইউটিউব দেখছে, কেউ খেলছে মোবাইল গেম। শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগীর সঙ্গে আসা শিশুদের মধ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খেলাধুলার মাঠ ও নিরাপদ বিনোদনের অভাবে অনেক শিশু অবসর সময় মোবাইল ফোনে কাটাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল ছাড়া শিশুরা খেতেও চায় না।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশির দাস চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে জানান, স্কুল, কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার ব্যস্ততার কারণে খেলাধুলার সুযোগ খুব কম। ফলে অবসর সময়ে ইউটিউব দেখা ও গেম খেলাই তার প্রধান বিনোদন। এতে তার চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে তিনি জানান।
রাহিমা বেগম নামে এক অভিভাবক বলেন, “মোবাইল ছাড়া আমার ছেলে খেতে চায় না। বাধ্য হয়েই তাকে মোবাইল দিতে হয়। তবে এখন এই অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করছি।”
আরেক অভিভাবক আকবর হোসেন বলেন, শহরে শিশুদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই। তাই সব সময় বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তবে তিনি মেয়ের মোবাইল ব্যবহারের সময় কমানোর চেষ্টা করছেন বলে জানান।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু রোগীদের ওপর সম্প্রতি পরিচালিত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শিশু-কিশোর মোবাইল আসক্তিজনিত কারণে দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সানবিন ইসলাম বলেন, শিশুদের মোবাইল আসক্তি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি মনে করেন, শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগের অভাব এবং পরিবারে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ না পাওয়াও এ সমস্যার অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, “শুধু চিকিৎসা দিয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, শহরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অনেক শিশুকে অল্প বয়সেই উচ্চমাত্রার চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন হাসপাতালে আসা শিশু রোগীদের একটি বড় অংশের চোখের সমস্যার সঙ্গে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে। অনেক অভিভাবক শিশুদের খাওয়ানো বা শান্ত রাখার জন্য মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেন। এতে শিশুরা যেমন আসক্ত হয়ে পড়ে, তেমনি তাদের দৃষ্টিশক্তির সমস্যাও বাড়ে।”
চিকিৎসকদের পরামর্শ, শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের সময় সীমিত করা, নিয়মিত বাইরে খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং চোখের যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক নজরদারিই শিশুদের দৃষ্টিশক্তি রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

Notify of
0 Comments
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
আরো দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ