সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি রিল ভিডিও পোস্টকে কেন্দ্র করে সমালোচনা ও সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার পর দেশজুড়ে শিক্ষক, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পাল। তার প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকারা একই গান ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় পাশে দাঁড়ানো সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিউটি পাল। তিনি বলেন, সবচেয়ে কঠিন সময়ে পরিবারের সদস্যদের সাহস ও সমর্থনই তাকে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করেছে।
গত ২৩ জুলাই নিজের ফেসবুক পেজে কয়েক সেকেন্ডের একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি পাল। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শাড়ি পরে হাঁটার ওই ভিডিওতে আশির দশকের জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড ডিফরেন্ট টাচের ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের একটি অংশ ব্যবহার করা হয়। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা, ট্রল ও ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু হয়। পরিস্থিতি একপর্যায়ে সাইবার হয়রানির রূপ নিলে ২৪ জুলাই তিনি ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
এরপর তার প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলে একই গানের অংশ ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেন। কেউ বিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, আবার কেউ বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে ভিডিও ধারণ করেন। ক্যাপশনে তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, অনলাইনে বিউটি পালের বিরুদ্ধে হয়রানির প্রতিবাদ এবং তার প্রতি সংহতি জানাতেই এ উদ্যোগ।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়িয়ে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের নজরেও আসে। প্রথমদিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠনের চিন্তাভাবনা থাকলেও পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সিলেট সফরকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ভিডিওটি সরাসরি না দেখলেও জেনেছেন এতে অশ্লীল কোনো বিষয় নেই। গান ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করাকে অন্যায় হিসেবে দেখারও কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। এরপর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে আর তদন্তের প্রয়োজন দেখছেন না তারা।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রতিক্রিয়ায় বিউটি পাল বলেন, দেশবাসীর ভালোবাসা ও সমর্থনে তিনি অভিভূত। তার ভাষায়, কিছু মানুষ নেতিবাচক মন্তব্য করলেও অধিকাংশ মানুষ যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিক, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, সহকর্মী এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ঘটনার শুরুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন উল্লেখ করে বিউটি পাল জানান, পরিবারের সদস্যরাই তাকে বুঝিয়েছেন যে তিনি কোনো অন্যায় করেননি। তাদের পরামর্শেই তিনি থানায় জিডি করেন। শিক্ষকতা পেশায় থাকা পরিবারের সদস্যরা তাকে সাহস জুগিয়েছেন। স্বামী, ভাই-বোনসহ সবাই পুরো সময় তার পাশে ছিলেন।
তিনি আরও জানান, তার ছোট মেয়ে বারবার তাকে বলেছেন, ‘মা, তুমি ঠিক আছো। আমি তোমার মতো হতে চাই।’ মেয়ের এই কথাগুলো তাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।
নিজেকে প্রযুক্তি ব্যবহারে খুব বেশি দক্ষ মনে করেন না উল্লেখ করে বিউটি পাল বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়মিত সহযোগিতা করেন। পুরো ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিবার, সহকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থনই তাকে সবচেয়ে বেশি শক্তি দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
