দেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল। বিশেষ করে ভিটামিন-এ ঘাটতিযুক্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
সংস্থাটি জানিয়েছে, এই প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। ২০০০ সালে হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৮ শতাংশে। দ্বিতীয় ডোজ চালুর পর ২০১২ সালে কভারেজ ছিল ২২ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১২১ শতাংশ। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামের রোগীর হারও দ্রুত কমে এসেছিল।
তবে ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ—এমআর১ ও এমআর২ কভারেজ কমে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকা। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়ে বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যেই রোগীর সংখ্যা বেশি। এমনকি অনেক শিশু রয়েছে, যাদের বয়স এখনো টিকা নেওয়ার উপযুক্ত হয়নি—যা সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, হাম নির্মূলে বাংলাদেশের আগের অগ্রগতি এখন হুমকির মুখে। জরুরি পদক্ষেপ না নিলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানায়, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের চলাচলের কারণে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এসব এলাকায় ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমার-এর দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যেখানে মানুষের অবাধ চলাচল সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে মিয়ানমারে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেশি এবং চলমান সংকটের কারণে সেখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল। অন্যদিকে ভারতে টিকাদান কভারেজ বেশি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে হামের ঝুঁকিকে ‘উচ্চ’ এবং বৈশ্বিক ঝুঁকিকে ‘মধ্যম’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। সংস্থাটি সব এলাকায় অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাকভারেজ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নজরদারি জোরদার, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এতে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল প্রদান এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কাজ করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিস্তার রোধে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
