শুক্রবার, মে ১, ২০২৬
No menu items!
বাড়িআন্তর্জাতিকসবুজ চায়ের আড়ালে ধূসর জীবন: ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদার দাবিতে চা শ্রমিকরা

সবুজ চায়ের আড়ালে ধূসর জীবন: ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদার দাবিতে চা শ্রমিকরা

পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা উদযাপিত হলেও বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনে সেই স্বস্তির ছোঁয়া এখনও অধরা। চোখ জুড়ানো সবুজ চা বাগানের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন ও বঞ্চনার বাস্তবতা।

দেশের বিভিন্ন চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বংশপরম্পরায় তারা এই পেশায় যুক্ত থাকলেও তাদের জীবনযাত্রার মানে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে টিলা থেকে টিলায় চা পাতা সংগ্রহ করাই তাদের প্রতিদিনের কাজ। কিন্তু এই কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে যে মজুরি তারা পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হয় না।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সামান্য আয়ে দুবেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। শুধু মজুরি নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আবাসন সুবিধার ক্ষেত্রেও চা শ্রমিকরা অনেক পিছিয়ে। অধিকাংশ বাগানে এখনও ভাঙাচোরা ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হয় তাদের। উন্নত চিকিৎসা সেবা ও সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগের অভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পেশায় আটকে পড়ছে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিক লাবনী গড় ও হীরা গোয়ালা আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের জীবনটা এই চা গাছগুলোর মতোই। সারাজীবন অন্যকে চা খাইয়ে চাঙ্গা করি, কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবনটা তেতোই থেকে যায়।”
আলীনগর চা বাগানের নারী শ্রমিক লক্ষী কৈরী ও সুনীতা রবিদাস বলেন, “আমরা শুধু পর্যটকদের ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়ে থাকতে চাই না। আমরা ন্যূনতম মজুরি, মানবিক মর্যাদা, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভালো বাসস্থান চাই।”
পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিকনেতা মহাদেব মাদ্রাজি বলেন, “চা শ্রমিকদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কম মজুরিতে কঠোর পরিশ্রম করানো হচ্ছে। এখনও তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা মজুরি বৃদ্ধি, ভূমি অধিকার, বাসস্থান ও চিকিৎসা সুবিধার উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের বসবাসের জমি নিজেদের নামে দেওয়া হলে তারা দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তি পাবে।”
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬৭টি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলাতেই রয়েছে ৯২টি বাগান। প্রায় ৮৫ হাজার ৫৪১ দশমিক ৬২ একর জমিতে চা চাষ হয়, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ উৎপাদন আসে এই অঞ্চল থেকে।
তবে এত বড় শিল্পে অবদান রাখার পরও প্রায় দেড় লাখ চা শ্রমিকের জীবনমান ক্রমেই নিম্নমুখী। ২০১৫ সালে তাদের দৈনিক মজুরি ছিল ৮৫ টাকা, যা আন্দোলনের পর ধাপে ধাপে বেড়ে ২০২২ সালে ১৭০ টাকায় উন্নীত হয়। বর্তমানে ৫ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধির ফলে তারা দৈনিক ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা মজুরি পাচ্ছেন। আগামী আগস্টে আরও ৫ শতাংশ বৃদ্ধির কথা থাকলেও, বাস্তবতার তুলনায় এই মজুরি এখনও অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করছেন শ্রমিকরা। সবুজ চায়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম আজও অব্যাহত। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে তাদের একটাই দাবি—ন্যায্য মজুরি, মানবিক জীবন ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।

 

Notify of
guest
0 Comments
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
আরো দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ