খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ স্টোরে অগ্নিকাণ্ডের ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি মেরামতকাজ। ফলে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা শতাধিক রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
দেড় মাস আগে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ থেকে মস্তিষ্কে টিউমারের অস্ত্রোপচারের জন্য খুমেক হাসপাতালে ভর্তি হন এছার জোমাদ্দার (৩৫)। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে অস্ত্রোপচার না হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দিনমজুর বাবা তোফাজ্জাল জোমাদ্দারের পক্ষে চিকিৎসা ব্যয় বহন করাই যেখানে কঠিন, সেখানে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া জোগাড় করাও হয়ে পড়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।
একই দুর্ভোগে রয়েছেন বাগেরহাটের রামপাল থেকে আসা সুলতানা আক্তার। স্নায়ুর অস্ত্রোপচারের জন্য গত ২০ মে তার অপারেশনের তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেদিনই হাসপাতালে আগুন লাগার ঘটনায় অপারেশন স্থগিত হয়ে যায়। এরপর কবে অস্ত্রোপচার হবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাননি তিনি। তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে তার স্বামীও হাসপাতালেই অবস্থান করছেন।
শুধু এছার বা সুলতানাই নন, অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা শতাধিক রোগী বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আগুনে অপারেশন থিয়েটার ও পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিটের অক্সিজেন লাইনের ক্ষতি হয়। ঘটনার পর থেকে হাসপাতালের জরুরি ও চক্ষু বিভাগের অপারেশন থিয়েটার বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ থাকায় পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিটও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
সোমবার (১ জুন) হাসপাতালের সার্জারি, নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি এবং বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, শত শত রোগী অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রতিদিন নতুন রোগী চিকিৎসার জন্য এলেও অপারেশন থিয়েটার সচল না থাকায় অনেককে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিংবা নতুন তারিখের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরা থেকে আসা শহিদুল ইসলাম বলেন, “দুই মাস আগে অপারেশনের তারিখ পেয়েছিলাম। সব প্রস্তুতি নিয়ে হাসপাতালে আসার পর জানতে পারি অপারেশন হবে না। আবার কবে হবে, কেউ বলতে পারছে না। শরীরের অবস্থাও দিন দিন খারাপ হচ্ছে।”
অনেক রোগী দূর-দূরান্তের জেলা থেকে এসেছেন। কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ ধারদেনা করে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করেছেন। দীর্ঘদিন হাসপাতালে অবস্থান করতে গিয়ে অনেকের সঞ্চিত অর্থও শেষ হয়ে গেছে।
হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের এক বিভাগীয় প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অপারেশন করতে না পারার বিষয়টি আমরা নিয়মিত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি। রোগীদের সামনে গিয়ে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছি না। যাদের অনেক আগেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, তাদের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে।”
খুমেক হাসপাতালের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, “গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ করছি। নির্বাহী প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন প্রায় শেষ। দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে তারা আশ্বাস দিয়েছেন।”
অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান দিলীপ কুণ্ডু জানান, অপারেশন থিয়েটারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। মূল সমস্যা অক্সিজেন লাইনে। এটি দেয়ালের বাইরে দিয়ে স্থাপন করা থাকায় দ্রুত মেরামত সম্ভব। বর্তমানে একটি অপারেশন থিয়েটার সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট বন্ধ থাকায় আইসিইউর ছয়টি শয্যা বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে আইসিইউ রোগীদের চিকিৎসাসেবাও চাপের মুখে পড়েছে।
খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম বলেন, “ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নের কাজ শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই মেরামতকাজ শুরু হবে। দ্রুত কাজ শেষ করে অপারেশন থিয়েটার সচল করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”
এদিকে রোগীদের দুর্ভোগ ও হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনে মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল ১১টায় খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর খুমেক হাসপাতাল পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
