শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলায় জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাবে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরে দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে, যা তীব্র গরমে জনভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
শ্রীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানায় বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করছে, ফলে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।
এক কারখানা কর্মকর্তা জানান, “বিদ্যুতের অভাবে নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি।”
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। দিনের পরিশ্রম শেষে ঘরে ফিরেও মিলছে না স্বস্তি। এক শ্রমিক বলেন, “গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমানোই কষ্টকর হয়ে গেছে। কাজের পর শরীরটা ঠাণ্ডা করার সুযোগ নেই।”
ডিজেল সংকটের কারণে সেচ কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটছে। কৃষকদের অভিযোগ, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে ফসল উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থীরাও পড়েছে বিপাকে। শ্রীপুরের হাজী ছোট কলিম স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক এসএসসি পরীক্ষার্থী জানায়, “রাতে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না।”
এদিকে, বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পোল্ট্রি খাতে। প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শ্রীপুরের খামারি আবু তালেব বলেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫-১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। এই গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় মুরগি মারা যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “জেনারেটর চালাতে তেল কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পাম্পে তেল না পেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।”
শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন জানান, “পোল্ট্রি খাত টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি জটিলতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং বাড়ছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২, মাওনা জোনাল অফিসের ডিজিএম শান্তনু রায় বলেন, “চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম থাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে ৩০-৩৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। প্রতিটি এলাকায় দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গাজীপুরের শিল্প, কৃষি ও পোল্ট্রি খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।
