গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রামে আড়াইশ বছরের বেশি সময় ধরে পৌষ সংক্রান্তিতে মাঘ মাসের প্রথম দিনে বসে আসছে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। স্থানীয়ভাবে এটি ‘জামাই মেলা’ নামে পরিচিত। একদিনের এই মেলায় লাখো মানুষের সমাগমের পাশাপাশি কোটি টাকার মাছ ও নানা পণ্যের বেচাকেনা হয়।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলা এ মেলায় মূল আকর্ষণ ছিল জামাই-শ্বশুরদের মাছ কেনার প্রতিযোগিতা। শ্বশুরবাড়ির দাওয়াতে আসা জামাইরা দূর-দূরান্ত থেকে বড় মাছ কিনে নিয়ে যান। অন্যদিকে জামাই আপ্যায়নের জন্য শ্বশুররাও বড় মাছ কিনতে ব্যস্ত থাকেন।
বিনিরাইল গ্রামের সংলগ্ন ফসলের মাঠে প্রায় দুই শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী বাহারি মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন। মেলায় চিতল, বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, কালী বাউশ, পাবদা, গুলসা, গলদা চিংড়ি, বাইম, ইলিশ, রূপচাঁদা, কাইকলা, পাখি মাছসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ বিক্রি হয়। মাছ ছাড়াও আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান বসে।
মেলায় বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে। এক কেজি ওজনের বালিশ আকৃতির মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকায়। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নানা আয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, ১৮ শতকে পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এই মেলার সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ‘জামাই মেলা’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতি বছর এ মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের গ্রামগুলোতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় ঈদ বা অন্য উৎসবে জামাই শ্বশুরবাড়িতে না গেলেও এই মেলায় তারা ঠিকই আসেন।
মেলায় ঘুরতে আসা কালীগঞ্জ পৌর এলাকার জামাই মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, “বহু বছর ধরে এই মেলায় আসছি। এটি এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। সব ধর্মের মানুষই আনন্দের সঙ্গে অংশ নেয়।”
দর্শনার্থী আলিফ বলেন, “বন্ধুর শ্বশুরবাড়ির দাওয়াতে এসেছি। মেলা ঘুরে নিজের ও বন্ধুর পরিবারের জন্য মাছ কিনবো।”
স্থানীয় যুবক সুমন জানান, “ব্যস্ততার মাঝেও এই মেলায় না এলে যেন মন ভরে না।”
মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, বড় আড়ৎ থেকে বড় আকারের মাছ এনে মেলার আকর্ষণ বাড়ানো হয়। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে এখন বেচাকেনার চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যাই বেশি।
আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন বলেন, “ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা এই মেলা এখন একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। একদিনেই কোটি টাকার বেশি বেচাকেনা হয়।”
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জাকির হোসেন জানান, মেলা উপলক্ষে পর্যাপ্ত পুলিশ ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, “এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও চিরায়ত বাংলার পরিচয় বহন করে।”
