বাড়িরাজধানীবেতন নিয়ে লুকোচুরি: মধ্যেরাতে শ্রমিক ক্ষোভে অচল মহাসড়ক,দীর্ঘ যানযট

বেতন নিয়ে লুকোচুরি: মধ্যেরাতে শ্রমিক ক্ষোভে অচল মহাসড়ক,দীর্ঘ যানযট

শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের শ্রীপুরে আবারও শ্রমিক অসন্তোষের জেরে উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। গত মে মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে তেলিহাটি ইউনিয়নের ‘তালহা স্পিনিং মিলস লিমিটেড’ এর শ্রমিকরা মধ্যরাতে সড়ক অবরোধ ও কারখানায় ভাঙচুর চালিয়েছেন। এর ফলে মহাসড়কের উভয় পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে হাজারো সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন চালকদের। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাত ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন গভীর রাত পর্যন্ত গড়ালেও কারখানা কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে।

​কারখানার ভেতরে অবস্থান ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন রাত ১১টার দিকে মহাসড়কে রূপ নেয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, মে মাস শেষ হয়ে জুন মাসও শেষের দিকে, অথচ এখনো তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
​আন্দোলনরত একাধিক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান,​”কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের শ্রমের মূল্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। বারবার বেতনের ডেট (তারিখ) দিয়েও তারা কথা রাখেনি। একদিকে জুন মাসের বেতন দেওয়ার সময় হয়ে গেছে, অন্যদিকে মে মাসের টাকাই আমরা পাইনি। আমাদের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে।”
​কারখানার ফিনিশিং বিভাগের শ্রমিক রত্না তাঁর ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন:
​”ঘরভাড়া দিতে পারছি না বলে বাড়িওয়ালা প্রতিদিন অপমান করছে। মুদি দোকানদার আর বাকি দিতে চাইছে না। সন্তান-সংসার নিয়ে আমরা এখন বাঁচব কীভাবে? বাধ্য হয়েই আমাদের মধ্যরাতে রাস্তায় নামতে হয়েছে।”
​অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটানো আরেক শ্রমিক সুমনা আক্তার বলেন, “না খেয়ে ডিউটি করছি, তবুও তাদের মন গলছে না। শখ করে মধ্যরাতে রাস্তায় বসে নেই। খুব কষ্টে সংসার চলছে। নাওয়া-খাওয়া বন্ধ। দোকানে বাকি বেড়েছে, বাসাভাড়ার জন্যও চাপ বাড়ছে।”
​একই সুর শোনা গেল শ্রমিক রানা-র কণ্ঠেও। তিনি জানান, কর্তৃপক্ষ একের পর এক ভুয়ো তারিখ দিয়ে শ্রমিকদের ঠকাচ্ছে, যার ফলে তাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।
​রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের সারি দীর্ঘ হতে থাকে। গাজীপুরের মাওনা থেকে শুরু করে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে স্থবির হয়ে পড়ে যান চলাচল। দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক এবং জরুরি সেবার যানবাহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকে। মধ্যরাতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে দেখা গেছে।
​যানবাহনের চালকরা বলছেন, শ্রমিকদের দাবি যৌক্তিক হলেও এভাবে মহাসড়ক অবরোধ করায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত এর সমাধান না হলে মহাসড়কের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
​পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তৎপরতা
​খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে দ্রুত ছুটে আসে মাওনা হাইওয়ে থানা পুলিশ এবং শিল্প পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সাথে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
​মাওনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন:​“রাত ১১টা থেকে শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছেন। রাত ১২টা পার হয়ে গেলেও অবরোধ চলছিল। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং সড়ক সচল করতে আমরা মালিকপক্ষের সঙ্গে জরুরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।”
​শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো লিখিত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শ্রমিকরা রাস্তা ছাড়বেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
​শ্রমিকদের এই যৌক্তিক পাওনা সময়মতো পরিশোধ না করায় বারবার কেন শিল্পাঞ্চলে এমন জনদুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে তা নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

Notify of
0 Comments
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
আরো দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ